মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা ও এর আশপাশের চা বাগান ও গ্রামীণ জনপদগুলোতে ইদানীং ঘন ঘন অজগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। বনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিষয়টি ইতিবাচক মনে হলেও, লোকালয়ে সাপের এই অবাধ বিচরণ স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। পরিবেশবাদী ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং খাদ্যসংকটের কারণে সাপগুলো লোকালয়ে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন চা বাগান এবং বসতবাড়ির আশপাশ থেকে বেশ কয়েকটি বড় আকৃতির অজগর এবং বিভিন্ন বিষধর সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় সচেতন ব্যক্তি ও বন্যপ্রাণী উদ্ধারকর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে খবর পেয়ে সাপগুলোকে নিরাপদে উদ্ধার করে গভীর বনে অবমুক্ত করলেও, বারবার সাপ বেরিয়ে আসার এই প্রবণতা জনমনে নানা প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীমঙ্গল তার অনন্য চা বাগান, পাহাড়ি টিলা এবং চিরহরিৎ বনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই অঞ্চলে অজগর (Python), পাইথনসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির সাপের নিরাপদ আবাস রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে নির্বিচারে গাছ কাটা, বনের পরিধি ছোট হয়ে আসা এবং চা বাগানগুলোয় আধুনিকায়ন ও মানবগতির তীব্রতা বৃদ্ধির ফলে বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বনের অভ্যন্তরে খাদ্য ও সুরক্ষার অভাব দেখা দেওয়ায় অজগরের মতো বিশাল আকৃতির সাপগুলো খাবারের সন্ধানে লোকালয়ের পোলট্রি খামার, হাঁস-মুরগির ঘর কিংবা জলাশয়ের আশপাশে হানা দিচ্ছে।
এছাড়া, গ্রীষ্ম ও বর্ষার পালাবদলে আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং অতিবৃষ্টির কারণে সাপের গর্তে পানি প্রবেশ করায় তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে। চা শ্রমিক ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ অনেক সময় না বুঝে সাপগুলোর মুখোমুখি হয়ে পড়েন, যা মানুষ ও বন্যপ্রাণী উভয়ের জন্যই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গলের স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা জানান, সাপের উপদ্রব বাড়লেও আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা সবচেয়ে জরুরি। কোনো এলাকায় সাপ দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে বন বিভাগ কিংবা বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংস্থাকে খবর দেওয়া উচিত। সাপ প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশের বন্ধু এবং ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণী দমনে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আতঙ্কিত হয়ে সাপ হত্যা না করে সেগুলোকে নিরাপদে প্রকৃতির কোলে ফিরিয়ে দেওয়া আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।
পরিবেশবাদীরা মনে করেন, শ্রীমঙ্গলের পর্যটন ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে বনের লতাপাতা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বন বিভাগ ও চা বাগান কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। অন্যথায়, মানুষের জনবসতি বৃদ্ধি এবং বনের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার ফলে বন্যপ্রাণী ও মানবজাতির সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
স্থানীয় একাধিক লোকজন বলেন, শ্রীমঙ্গলের বন্যপ্রাণী সেবা ফান্ডেশন না থাকলে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করত। কোথায় কোন সাপ দেখা পাওয়া গেলে খবর পেয়ে সাথে সাথে ফাউন্ডেশনের লোকজন চলে এসে উদ্দার কার্যক্রম চালায়।
Developed By Radwan Web Service