প্রতিবেশীকে ফাঁসানোর জঘন্য খেলায় নিজের রক্তেই গড়া কোল আলো করা সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট মণিটাকে নিষ্ঠুরভাবে গলা কেটে যারা চিরতরে নিভিয়ে দিয়েছিল, ১২ বছর পর অবশেষে সেই নির্মম পিতার ফাঁসির রায় ঘোষণা করেছে আদালত। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক মো. আনোয়ারুল হক এই চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় শুনলেই আজও শিউরে ওঠে সাধারণ মানুষের বুক।
রাতের আঁধারে যে নির্মমতার শুরু
সালটা ছিল ২০১৪। তারিখটা ১০ ফেব্রুয়ারি। ঘড়ির কাঁটায় তখন গভীর রাত ৩টা। কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের পূর্ব ভানুবিল গ্রামের বসতঘরটিতে তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন পুরো পরিবার। কিন্তু সেই ঘুমে আচ্ছন্ন অবুঝ শিশু সাড়ে তিন বছরের রুনা বেগম জানত না, যার বুকের ওম পাওয়ার কথা, সেই জন্মদাতা পিতাই আজ যমদূত হয়ে তার মাথারিয়েই দাঁড়িয়েছে। ধারালো দা দিয়ে ঘুমের মধ্যে ছোট্ট রুনার গলা কেটে হত্যা করা হয়।
প্রতিশোধের নেশা নাকি পৈশাচিকতা?
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল এক ভয়ংকর প্রতিহিংসা। চাচাতো ভাইদের সাথে দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিবেশী সালেক মিয়াকে চিরতরে ফাঁসাতে আর প্রতিশোধের আগুন মেটাতে নিজের আদরের সন্তানকে বলিদান দেয় পাষণ্ড বাবা শরীফ আলী। নিজের মেয়েকে খুন করে সমস্ত দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয় নিরীহ প্রতিবেশীদের ওপর।
কিন্তু নির্মম এই অপরাধের সত্যতা চাপা থাকে না। তদন্তে বেরিয়ে আসে এক বিভীষিকাময় সত্য। নিহত শিশুর মা এবং অভিযুক্তের নিজের স্ত্রী নেকজান বিবি স্বামীর এই পৈশাচিক রূপ টের পেয়ে আদালতে মামলার দ্বারে যান। পরবর্তীতে ঘাতক বাবা শরীফ আলী আদালতে ১৬৪ ধারায় নিজের মেয়েকে হত্যার কথা স্বীকার করে রোমহর্ষক জবানবন্দি দেয়।
অবশেষ ন্যায়বিচার
দীর্ঘ ১২ বছরের আইনি লড়াই, সাক্ষ্যপ্রমাণ আর কাঠগড়ায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর আজ সোমবার আদালত আসামি শরীফ আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
নিজের স্বার্থের বলি হয়ে ঝরে যাওয়া ছোট্ট রুনার নিষ্পাপ মুখখানি আজও যেন কমলগঞ্জের আকাশে বাতাসে বিচার খুঁজে ফেরে। আজ এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার পেলেও, পৃথিবীর কোনো আদালতই এক মায়ের বুক খালি হওয়ার যন্ত্রণা ফেরাতে পারবে না।
Developed By Radwan Web Service