প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা যেন রূপকথার এক ক্যানভাস। সবুজ পাহাড়ের ঢেউ, গহিন অরণ্য, চিরসবুজ চা বাগান, কলকল্লোলিনী নদী আর ঝরনার রিমঝিম শব্দে মুখরিত এই জনপদ। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রেও কমলগঞ্জ এখন একটি বিশেষ আকর্ষণের নাম। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে ‘ট্যুরিজম কমলগঞ্জ’ সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার মাধ্যমে এই জনপদের অপার পর্যটন সম্ভাবনা আজ বিশ্ব দরবারে নতুন করে তুলে ধরার সময় এসেছে। পাহাড়, প্রকৃতি, চা বাগান, হ্রদ, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে কমলগঞ্জ আজ দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্য।

কমলগঞ্জের সৌন্দর্যের মুকুটে সবচেয়ে বড় রত্ন হলো লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। প্রায় ১২৫০ হেক্টর আয়তনের এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল চিরসবুজ বৃক্ষরাজি আর দুর্লভ বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। এখানে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সুবিশাল মাকড়সা জাল সদৃশ গাছের ছাতা আর রোদের লুকোচুরি খেলা। লাউয়াছড়ার মূল আকর্ষণ বিশ্ববিখ্যাত উল্লুক যা বাংলাদেশের আর কোথাও সচরাচর দেখা যায় না। এছাড়া মুখপোড়া হনুমান, চশমা পরা হনুমান, অজগর, এবং শত প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে এই উদ্যান। বনের বুক চিরে চলে যাওয়া রেললাইন আর পিচঢালা পথ ধরে হাঁটলে মনে হয় যেন অন্য কোনো দুনিয়ায় পৌঁছে গেছেন পর্যটকরা।

মাধবপুর লেক। পাত্রখোলা চা বাগানের ভেতরে অবস্থিত এই লেকটি প্রকৃতির এক নিখুঁত সৃষ্টি। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে গড়ে ওঠা এই লেকের নীলজলরাশি আর চারপাশে চা পাতার সবুজ গালিচা পর্যটকদের মন কেড়ে নেয়। শীত মৌসুমে এই লেকে হাজার হাজার অতিথি পাখির আগমন ঘটে, যা এর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। লেকের চারপাশের ছোট ছোট টিলা আর ছায়াঘেরা পরিবেশ দর্শনার্থীদের দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে বাধ্য করে। রয়েছে দৃষ্টিনন্দন ক্যামেলিয়া লেক, যা চা বাগানের চা পাতার সবুজ আর পাহাড়ের ঢালে এক স্নিগ্ধ পরিবেশ তৈরি করে।
কমলগঞ্জের আরেকটি অবিস্মরণীয় রোমাঞ্চকর গন্তব্য হলো গহিন বনে লুকিয়ে থাকা হামহাম জলপ্রপাত। রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীর অরণ্যে কুরমা বিট এলাকায় অবস্থিত এই জলপ্রপাতটি প্রায় ১৩০-১৪০ ফুট উঁচুটি থেকে সশব্দে নিচে আছড়ে পড়ে। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ঝিরিপথ ও জঙ্গল পেরিয়ে এই জলপ্রপাতে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা পর্যটকদের মনে রোমাঞ্চ জাগায়। ঝরনার ঠান্ডা পানিতে গা ভিজিয়ে ক্লান্তি দূর করার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
প্রকৃতির পাশাপাশি কমলগঞ্জ সমৃদ্ধ এক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভ কমলগঞ্জের ধলই চা বাগানে অবস্থিত। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখতে গিয়ে তিনি শহীদ হন। তাঁর এই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন।
কমলগঞ্জের ভূগোলে রয়েছে বিভিন্ন নদী, খালবিল ও হাওরের মেলবন্ধন। ধলাই নদী, জুড়ি নদীসহ অসংখ্য ছোট বড় নদী এই অঞ্চলের বুক চিরে বয়ে গেছে। বর্ষায় এসব নদীর দুই তীরের সবুজ প্রান্তর এবং হাওরের জলরাশি এক নান্দনিক রূপ ধারণ করে। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রা এবং গ্রামীণ মেঠোপথ এই জনপদকে আরও মোহনীয় করে তোলে।
এই উপজেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর বহুসাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। মণিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারো এবং টিপরাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এখানে যুগ যুগ ধরে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। তাদের নিজস্ব ভাষা, বর্ণিল পোশাক, ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গান এই অঞ্চলের সংস্কৃতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মণিপুরী সম্প্রদায়ের হোলি উৎসব বা রাস উৎসব কিংবা খাসিয়া পুঞ্জির জীবনযাত্রা দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভিড় জমান। তাদের হস্তশিল্প এবং তাঁতের শাড়ির খ্যাতি দেশজুড়ে রয়েছে।
পর্যটকদের থাকার ও খাওয়ার জন্য কমলগঞ্জে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের নানা সুযোগ-সুবিধা। আধুনিক সব রিসোর্ট, ইকো-রিসোর্ট, কটেজ এবং মানসম্মত রেস্টুরেন্ট পর্যটকদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন রিপোর্স ।পর্যটকরা খুব কাছ থেকে স্থানীয় গ্রামীণ জীবন ও চা শ্রমিকদের সংস্কৃতি উপভোগ করতে পারেন।
পাহাড়ে ঘেরা সবুজ প্রকৃতি, ঝরনার কলতান, চা বাগানের সুবাস, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মিতালি—সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ এক পূর্ণাঙ্গ পর্যটন জনপদ। প্রকৃতির নিখুঁত রূপ দেখতে এবং রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে প্রতিবার ছুটির দিনে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন এই সবুজ ভূমে।
ট্যুরিজম কমলগঞ্জ এই উদ্যোগের মাধ্যমে কমলগঞ্জের পর্যটন খাত আরও বেগবান হবে এবং বিশ্ব দরবারে এই অঞ্চলের অপার সম্ভাবনা এক নতুন পরিচিতি লাভ করবে। আগামী রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটক দিবস উদযাপনের লক্ষে আয়োজন করা হয়েছে শোভযাত্রা ও আলোচনা সভা। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন জাতীগোষ্ঠীসহ নানা শ্রেণিপেশার লোকজন অংশগ্রহণ করবে।
ট্যুরিজম কমলগঞ্জ এর আহবায়ক শাব্বির এলাহী জানান, কমলগঞ্জ উপজেলায় অনেক কিছু দেখা ও জানার মতো রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থান রয়েছে। এগুলোকে দেশ ও বিশ্ব দরবারে বিকশিত করার লক্ষ্যে ট্যুরিজম কমলগঞ্জ উদ্যাগ গ্রহণ করেছে। কমলগঞ্জকে প্রমোট করার লক্ষে কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
Developed By Radwan Web Service