
একটি গাছের ছায়া পেতে বা একে পরিণত দেখতে বছরের পর বছর ধরে প্রকৃতি ও মানুষের প্রহর গুনতে হয়। অথচ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই সবুজ সম্পদ কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে স্বার্থান্বেষী চোরচক্র। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর সড়কের ঘোরামারা এলাকায় এক রাতেই ১৪টি বৃহদাকারের মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করার ঘটনা শুধু একটি পরিবেশগত বা আর্থিক অপরাধই নয়, বরং স্থানীয় স্থানীয় প্রশাসন ও তদারকি ব্যবস্থার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, ইলেকট্রিক করাত দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী ইউক্যালিপটাস ও জামগাছগুলো কেটে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়। আনুমানিক আড়াই থেকে তিন লক্ষ টাকার এই রাষ্ট্রীয় ও পরিবেশগত সম্পদের ক্ষতি কেবল অংকেই সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, অদূরেই রাজকান্দি বনরেঞ্জের কার্যালয়, সড়কে চেকপোস্ট এবং নিয়মিত পুলিশি টহল থাকা সত্ত্বেও তিন-চার ঘণ্টা ধরে চলা এই মহোৎসব কারো চোখেই পড়ল না! একে নিছক ‘গাছ চুরি’ বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই; স্থানীয় প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সংশয় যথার্থ—এটি একটি সংঘবদ্ধ বড় সিন্ডিকেটের কাজ, যা প্রশাসনিক শিথিলতা কিংবা সর্ষের ভেতর ভূতের উপস্থিতি ছাড়া সম্ভব নয়।

আমাদের দেশে সামাজিক বনায়নের গাছ রক্ষা ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নিরাপত্তা দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন বিভাগের ভূমিকা সর্বাগ্রে। কিন্তু কমলগঞ্জের ঘটনায় প্রশাসনের নীরবতা ও গাফিলতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও ‘ওসি ছুটিতে থাকা’ বা কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার অছিলায় বিচার প্রক্রিয়া যেন দীর্ঘসূত্রী না হয়। কারণ, অপরাধীরা যখন দেখে অপরাধ করে সহজে পার পাওয়া যায়, তখন তাদের বেপরোয়া মনোভাব বহুগুণ বেড়ে যায়।
এভাবে যদি রাস্তার পাশের ও সংরক্ষিত বনের গাছ উধাও হতে থাকে, তবে দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অতি দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
স্বচ্ছ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: কোনো অজুহাত না দেখিয়ে আদমপুরের গাছ চুরির পেছনের মূল হোতা ও সিন্ডিকেট চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: রাজকান্দি বনরেঞ্জ কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট চেকপোস্টের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং রাতের টহল পুলিশের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রহরা ও নজরদারি বৃদ্ধি: ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং টহল জোরদার করতে হবে, যাতে ইলেকট্রিক করাতের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীরা পার না পেয়ে যায়।
সামাজিক প্রতিরোধ: স্থানীয়দের নিয়ে পরিবেশ সুরক্ষা কমিটি গঠন করে অবৈধ গাছ কাটা প্রতিরোধে সম্মিলিত সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
গাছ শুধু কাঠ বা টাকার হিসাব নয়, এটি আমাদের জীবনধারণের অক্সিজেনের উৎস এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের রক্ষাকবচ। কমলগঞ্জের এই গাছ চুরির বিচার যদি দৃষ্টান্তমূলকভাবে না হয়, তবে তা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করবে এবং আমাদের সংরক্ষিত বনগুলো অচিরেই বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়বে। পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনের দায়িত্বশীল, দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপই এখন স্থানীয় জনতার দাবি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : পিন্টু দেবনাথ , মৌলভীবাজার, সিলেট, বাংলাদেশ। মোবাইলঃ 01716362944
ইমেইল : pintupress@gmail.com
© ২০২৪ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | কমলকুঁড়ি | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি