সদ্য সংবাদ

বাাংলাদেশ আমলের শিক্ষা নীতি ও কিছু কথা – মোঃ জুয়েল আহমেদ

15193428_1100123696753558_1363435913874700067_nবাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে শিক্ষাকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সংবিধানের ১৫ (ক), ১৭ এবং ২৮ (৩) নং আর্টিকেলে বাংলাদেশের নাগরিকদের শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায়, বাংলাদেশ সরকার সে সময়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের উপযোগী সমাজগঠনমূলক একটি সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরাত-এ খুদাকে সভাপতি করে শিক্ষা কমিশন গঠনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয় যা ১৯৭৪ সালের মে মাসে ‘বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট নামে প্রকাশিত হয়। এটি পরবর্তীকালে ড. কুদরাত-এ-খুদার নামানুসারে ‘ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট’ নাম রাখা হয়।
১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলনীতির আলোকে শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর পদক্ষেপ হিসেবে বিপুল সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালন, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে দেশের ৩৬,৬৬৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত সকল শিক্ষক এবং স্কুলের যাবতীয় সম্পদ সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং এই পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় এবং প্রায় প্রত্যেকটি কমিশন রির্পোটে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হলেও সে সময়ে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রথম (১৯৭৩-৭৮) এবং দ্বিতীয় (১৯৮০-৮৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় দেশের ৮টি অঞ্চলে ৪৪টি থানায় International Development Agency (IDA)-এর অধীনে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা (Universal Primary Education) প্রবর্তিত হয়। এছাড়া প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার (Non-formal Education) জন্য একটি ব্যাপক পরিকল্পনা গৃহীত হয়, যেমন গণবিদ্যালয়, সাক্ষরতা বিদ্যালয়, ফিডার স্কুল (Feeder School) যা প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রসরকল্পে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এছাড়া, বিদ্যমান প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম অন্তর্বর্তীকালীন দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনায়ও (১৯৭৮-৮০) অপরিবর্তিত ছিল। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার সফল উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি স্বতন্ত্র প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তীকালে ১৯৮১ সালে প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে একটি আইন প্রণয়ন করা হয় যা ‘প্রাথমিক শিক্ষা আইন-১৯৮১’ নামে পরিচিত। এই আইনের অধীনে মহকুমা পর্যায়ে স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ (Local Education Authority) গঠন করা হয় এবং প্রাথমিক শিক্ষায় পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসন ও তত্ত্বাবধান স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত করা হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশতঃ আইনটি বাস্তবায়নের পূর্বেই বাতিল হয়ে যায়। ১৯৮২ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও বিকেন্দ্রীকরণ অর্ডিন্যান্স জারির ফলে ১৯৮৩ সালে মহকুমা বিলোপ করে থানাকে উপজেলা পর্যায়ে উন্নীত করা হয় এবং উপজেলা প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক আদেশ বলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব উপজেলা পরিষদের হাতে ন্যস্ত করে। তখন উপজেলা প্রশাসনের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসন, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে উপজেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে প্রেরণ করা হয়। এ ছাড়াও এ আইনে চাকরি নিয়োগ বিধি, শৃঙ্খলা বিধি, ছুটি, বদলি, পদোন্নতি, অবসর গ্রহণ ইত্যাদি সংক্রান্ত আইন-কানুন ও বিধি-বিধানও রয়েছে।
তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে (১৯৮৫-৯০) IDA এর অধীনে Universal Primary Education প্রকল্প চালু থাকার সাথে সাথে দেশব্যাপী সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার জাতীয় প্রকল্প চালু হয়। সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতিকল্পে সমন্বিত স্কুল উন্নয়ন নামে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ পরিকল্পনা অনুসারে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির সার্বিক উন্নতি বিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া এই পরিকল্পনার ফলশ্রুতিতে দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প ‘Second Primary Education Project (SPEP)’ বাস্তবায়ন করা হয়। এটি ছিল সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে একমাত্র সরকারি প্রজেক্ট যা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালনা করে। এই প্রকল্প বাংলাদেশ সরকার ও ৪টি আন্তর্জাতিক সংস্থা IDA, UNICEF, CIDA এবং UNDP-এর যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়। এর মাধ্যমে স্কুলে ছাত্রছাত্রীর ভর্তি হার বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপ্ত করার সহায়ক কর্মসূচি হিসেবে SMC (School Managing Commitee), PTA, UEC (Upazila Education Commission) গঠন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও সিলেবাসের নবায়ন ও উন্নয়ন করা হয় এবং সকল শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে বই সরবরাহ করা হয়। এ সময় ৪টি পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার কাজ পরিচালিত হতো। এগুলো হল- শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, উপজেলা পরিষদ এবং স্কুল ম্যানেজিং কমিটি।
চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৯০-৯৫) প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯০ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক আইন’ গৃহীত হয় এবং ঐ বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ গেজেটের এক অতিরিক্ত সংখ্যায় বিজ্ঞাপিত হয়। ১৯৯২ সালে ১ জানুয়ারি থেকে সারা দেশের ৬৮টি থানায় বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। এছাড়া ১৯৯০ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইনটির বাস্তবায়ন ও মনিটরিং ইউনিট (Compulsary Primary Education Implementation Monitoring Unit-CPEIM) গঠিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামোকে শক্তিশালী করা, সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯২ সালের আগস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ (Primary and Mass Education Division-PMED) নামে একটি নতুন বিভাগ গঠিত হয়। এর অধীনে প্রাথমিক শিক্ষায় সার্বিকভাবে ভর্তিহার বৃদ্ধি, ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর সম-অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষার সঠিক ও গুণগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যালয় নির্মাণের প্রকল্পও পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়ন করা হয়। ১৯৯৫ সালে পল্ললীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যালয় গমনোপযোগী ৬-১০ বছরের শিশুদের জন্য ‘স্যাটেলাইট স্কুল’ তৈরি করা হয় এবং প্রাথমিকভাবে সারাদেশে ৪০০০ স্কুল তৈরি করা ও ২০০০ সালের মধ্যে এর সংখ্যা ৬ হাজারে উন্নীত করার প্রকল্প হাতে নেওয়া |
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত দেশিয় এবং পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা ও পদ্ধতির সম্মিলিত ফল। হাজার বছরের আর্য বা হিন্দু শিক্ষাব্যবস্থা, বৌদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা এবং সর্বশেষ মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার সংমিশ্রণ, সাথে রয়েছে পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো। প্রকৃতপক্ষে ১৪৯৮ সালে ভাস্কো-দা-গামা কর্তৃক ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কারের পর থেকেই এই উপমহাদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রচার ও প্রসার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কালক্রমে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি, দিনেমার এবং ইংরেজ মিশনারিগণ এদেশে শিক্ষা বিস্তারের বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ৫ বছর মেয়াদী প্রাথমিক শিক্ষা প্রচলিত রয়েছে। ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা স্তর হিসেবে গণ্য করা হয় এবং দেশের ৬ থেকে ১০ বছরের সব শিশুর জন্য এই শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত বয়সসীমা যাই থাকুক না কেন বাস্তবে বাংলাদেশে ৪/৫ বছর থেকে শুরু করে ১৩ বছর পর্যন্ত বয়সের ছেলেমেয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় বিদ্যালয়ে ভর্তিকৃত সকল শিশুর সামর্থ্য ও চাহিদার প্রতি সচেতন দৃষ্টি রেখে সার্বিকভাবে ৯টি বিষয়কে শিক্ষাক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যথা- বাংলা, গণিত, পরিবেশ পরিচিতি: সমাজ, পরিবেশ পরিচিত: বিজ্ঞান, ইংরেজি, ধর্ম, শারীরিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা এবং সংগীত। এক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পরিবেশ পরিচিতি সমাজ ও বিজ্ঞান একটি সমন্বিত বিষয় হলেও তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পরিবেশ পরিচিতি: সমাজ ও পরিবেশ পরিচিত: বিজ্ঞান নামক দুটি বিষয় পৃথকভাবে পাঠ্যক্রমে রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রধানত চার ধরনের বিদ্যালয় রয়েছে। যথা- সরকারি বিদ্যালয়, পরীক্ষণ বিদ্যালয় যা  এর সাথে সংযুক্ত, নিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কমিউনিটি বিদ্যালয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পরীক্ষণ বিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণরূপে সরকারি অর্থে পরিচালিত। অন্যদিকে নিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের বেতনের শতকরা ৯০% সরকারের কাছ থেকে পেয়ে থাকেন। আর কমিউনিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে বেতন পেয়ে থাকেন। উল্লেলখিত চার ধরনের বিদ্যালয় ছাড়াও অনিবন্ধীকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাই স্কুল সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডার গার্টেন এবং কিছু এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে এবতেদায়ী মাদ্রাসা এবং হাই মাদ্রাসা সংযুক্ত ইবতেদায়ী মাদ্রাসা (সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমান্তরাল)।

এভাবে সরকার প্রাথমিক শিক্ষার গুনগত মানকে অক্ষুন্ন রাখতে নানা প্রকল্প গ্রহন করে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রাথমিক শিক্ষার যে পরিবেশ এনছে তা সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ১৬ হাজার  স্কুলকে সরকারী করণ ও শিক্ষকদের চাকুরী সরকারী করণ। এয়াড়া যে ভাবে স্কুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণসহ নানা প্রদক্ষেপের কারনে প্রাইমারী শিক্ষা আজ উচ্চতরে অবস্তান করছে। তথ্য সূত্র (বিভিন্ন গ্রন্থ)