সদ্য সংবাদ

৬ ডিসেম্বর: এই দিনে কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা ও কুলাউড়া শক্র মুক্ত হয়

কমলগঞ্জ

1
৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার স্বাধীনতার উষালগ্নে ১৯৭১সালের এই দিনে মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলা হানাদারমুক্ত হয়েছিলো। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর সাড়াঁশি অভিযানের মুখে বিপর্যস্ত হয়ে কমলগঞ্জের দখলদারিত্ব ছেড়ে পালিয়ে যায় পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী। এই দিনে কমলগঞ্জের মুক্তিপাগল বাঙ্গালি উড়িয়ে দেয় স্বাধীনতার পতাকা।  পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কমলগঞ্জে সর্ব দলীয় সংগ্রাম পরিষদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই এখানে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্ত্ততি। মুক্তিযোদ্ধের প্রতি অনুগত ৬০ জনের একটি দল তৈরী করে উপজেলার শমশেরনগর বিমান ঘাটিতে ট্রোনিং এর কাজ চলতে থাকে। ১০ মার্চ ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলের নেতৃত্বে এক দল পাক সেনা মৌলভীবাজারে অবস্থান নেয়। ২৩শে মার্চ পাকিস্থান দিবসে তৎকালিন ছাত্রনেতা নারায়ন ও অব্দুর রহিম পাকিস্থানী পতাকা পুড়ানোর দায়ে গ্রেফতার হন। পরে অবশ্য জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কমলগঞ্জ উপজেলা ছিল বামপন্থিদের সুদৃঢ় ঘাটি। তারা মৌলানা ভাষানি ও হক তোহায়া গ্রুপের সাথে সংশি¬¬ষ্ট ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা লগ্নে নকশাল পন্থিদের নির্মূল করার অজুহাতে মেজর খালেদ মোশাররফকে কমলগঞ্জে পাঠানো হয়। তিনি ছিলেন বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তা। ২৫শে মার্চ গণ হত্যা শুরু হলে তিনি পাক বাহিনীর সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে জনতার কাতারে সামিল হন। ঢাকায় এ গণ হত্যার প্রতিবাদে ২৬শে মার্চ কমলগঞ্জে সর্ব দলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বের হয়। পাক সেনারা সেই মিছিলের উপর গুলি চালালে সিরাজুল ইসলাম নামে একজন বৃদ্ধ শহীদ হন। এ হত্যাকান্ডে উপজেলাবাসীর মনে জ্বলে উঠে প্রতিশোধের আগুন। স্থানীয় বাঙ্গালী ইপিআর ও পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরাও একাত্মতা ঘোষনা করে সংগ্রাম পরিষদের সাথে। ২৮শে মার্চ শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির সমস্ত অস্ত্র উঠিয়ে আনা হয়। মালগাড়ির বগি দিয়ে ভানুগাছ-শমশেরনগর-মৌলভীবাজার রাস্তায় বেরিকেড দেওয়া হয়। ২৯শে মার্চ পাক বাহিনী খবর পেয়ে আবারও কমলগঞ্জে আসে। সন্ধ্যায় পাক সেনারা ভানুগাছ থেকে শমশেরনগরে এলে মুক্তিসেনাদের অতর্কিত আক্রমনে ক্যাপ্টেন গোলাম রসুল সহ ৯ জন পাক সেনা নিহত হয়। স্বাধীনতার উষা লগ্নের এই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে প্রচুর অস্ত্র গোলাবারুদসহ পাক সেনাদের ২টি গাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বপ্রথম এই সশস্ত্র যুদ্ধে বিজয় লাভের পরদিনই কমলগঞ্জে মুক্তি পাগল জনতার এক বিরাট সমাবেশে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা পরিষদ। এর পর থেকেই নিয়মিত চলতে থাকে দলে দলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ। ২৮ মার্চের পর পাক বাহিনী জল স্থল ও আকাশ পথে কমলগঞ্জে সাঁড়াশি আক্রমন শুরু করে। মুক্তি বাহিনী তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মোকাবিলায় সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছে। এ উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৩টি ঘটনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে পাত্রখোলা, ধলাই ও ভানুগাছের যুদ্ধ। ন্যাপ নেতা মফিজ আলী, ক্যাপ্টেন মোজাফফর আহমদ, আওয়ামীলীগ নেতা এম, এ, গফুর, ময়না মিয়া, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমান প্রমুখের সাহসী নেতৃত্বে কমলগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধারা অসীম সাহসীকতার সাথে লড়েছেন। এখানকার বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন বঙ্গবীর এম, এ, জি ওসমানী, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ, বিগ্রেডিয়ার আমিন আহম্মদ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মত দেশ বরেণ্য ব্যক্তিরা। এ উপজেলার বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, ল্যান্সনায়েক জিল¬ুর রহমান, সিপাহী মিজানুর রহমান, সিপাহী আব্দুর রশিদ, সিপাহী শাহাজাহান মিয়া সহ নাম না জানা অনেকেই। ৪ঠা ডিসেম্বরে ভানুগাছ এলাকায় প্রচন্ড যুদ্ধের পর কমলগঞ্জ সদর থেকে পাক হানাদাররা পিছু হটতে বাধ্য হয়। কমলগঞ্জের মাটিতে উড়ে স্বাধীনতার পতাকা। ৪ ডিসেম্বর তারিখে কমলগঞ্জের ভানুগাছ বাজারের নিকর্টবর্তী ধলাই ব্রীজে সম্মুখ যুদ্ধে ৩ জন ও কমলগঞ্জ থানার সামনে জাতীয় পতাকা উড়ানোর সময় অপর একজন অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সদস্য পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। এরা হলেন কুমিল¬া মুরাদনগরের কালাপাইনা গ্রামের সিপাহী মোঃ মিজানুর রহমান, দেবীদ্বারের বড় শালঘর গ্রামের সিপাহী আব্দুর রসিদ, পাবনা শাহাদাৎপুরের দারগাপাড়া গ্রামের ল্যান্স নায়েক জিল¬ুর রহমান, চট্রগ্রামের নিরশ্বরাইয়ের মগাদিয়া গ্রামের সিপাহী মোঃ শাহাজান মিয়া। দেশের জন্য সম্মুখ যুদ্ধে নিজের জীবন উৎসর্গকারী এই ৪ বীর যোদ্ধাকে ৫ই ডিসেম্বর সকালে পার্শ্ববর্তী আলীনগর ইউনিয়নের পশ্চিম কামুদপুরে দাফন করা হয়। এর পরদিন ৬ ডিসেম্বর কমলগঞ্জ মুক্ত হয়েছিল।

শ্রীমঙ্গল

2
আজ ৬ ডিসেম্বর, শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল মুক্ত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের এই দিনে লড়াকু মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই করে হানাদার বাহিনীকে শ্রীমঙ্গল থেকে হটিয়ে শত্রুমুক্ত করেছিল। তবে এর আগে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে নিহত হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণের মুখে শ্রীমঙ্গল শহর ছেড়ে পালিয়েছিল পাক-হানাদার বাহিনী। তবে এই মুক্তির স্বাদ নিতে গিয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে চা বাগান ঘেরা এই জনপদের মানুষকে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর তৎকালীন সংসদ সদস্য আলতাফুর রহমান, কমান্ডার মানিক চৌধুরৗ ও ফরিদ আহম্মদ চৌধুরীর নেতৃত্বে শ্রীমঙ্গলে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। ২৩ মার্চ শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সামনে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলার রক্তাক্ত পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ৬ ডিসেম্বর শহরের ভানুগাছ সড়ক দিয়ে আবারও পৌরসভা চত্বরে প্রবেশ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। সেখানে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে বিজয়ের উল্লাসে মেতে উঠেন তারা। উপজেলার সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিটি রয়েছে সিন্ধুরখান ইউনিয়নে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সেদিন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল এ অঞ্চলের নিরীহ চা শ্রমিকরা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এক পর্যায়ে ৩০ এপ্রিল পাক-হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে গণহত্যা চালায় তাদের উপর। যুদ্ধের ব্যাংকার বানানোর কথা বলে শহর সংলগ্ন ভাড়াউড়া চা বাগানে প্রবেশ করে সেখানে এক সঙ্গে ৫৪ জন চা শ্রমিককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের উপর গুলি চালায় পাক-বাহিনী।

ভাড়াউড়া বধ্যভূমি স¤পর্কে উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা কুমুদ রঞ্জন দেব বলেন, এখানে ১৯৭১ এ ৫৪ জন চা শ্রমিককে একসঙ্গে নিয়ে এসে পাক-হানাদার বাহিনী হত্যা করে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রেখেছিল। এই বধ্যভূমির একটি স্মৃতিফলক আছে। শ্রীমঙ্গলে সকল বধ্যভুমিতে স্বৃতিস্তম্ভ করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী বরাবরে আবেদন জমা দেয়া হয়েছে। কুমুদ রঞ্জন দেব আরো বলেন, আজ ৬ ডিসেম্বর আমরা শ্রীমঙ্গল মুক্ত দিবস পালন করব। ৬ ডিসেম্বরের এই দিনে উপজেলার সকল মুক্তিযোদ্ধারা সকালে শ্রীমঙ্গল বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন বধ্যভূমিতে পু¯প অর্পণ করব। এদিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলা মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে স্থানীয় আওয়ামীলীগ, যুব লীগ,ছাত্রলীগ সহ মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল জনগণকে আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে দিবসটি পালনের জন্য আহ্বান করেছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ সমর্থক গোষ্ঠী।

বড়লেখা

আজ ৬ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলা পাকহানাদার মুক্ত হয়। ১৯৭১ সালে দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে বড়লেখাবাসী জেগে উঠে রণহুঙ্কারে। ৩২৫টি গ্রাম যেনো প্রতিরোধের দুর্গে পরিণত হয়। বড়লেখা মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ উপজেলা কমান্ড কাউন্সিল আজ আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। জানা গেছে, বড়লেখা ৪ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। মেজর সিআর দত্ত সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। সাবেক সংসদ সদস্য দেওয়ান ফরিদ গাজীর নেতৃত্বে এ সেক্টরের সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের করিমগঞ্জে। বড়লেখা থানার পার্শ্ববর্তী বারপুঞ্জি ও কুকিরতলে স্থাপিত সাব-সেক্টরের মুক্তি সেনারা হানাদারদের বিরুদ্ধে অসংখ্য ছোট বড় আক্রমণ চালিয়েছে। যুদ্ধের সূচনাতেই বড়লেখাবাসী বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাক হানাদাররা বড়লেখা ছাড়তে বাধ্য হয়। ভোরে বড়লেখা সম্পূর্ণ শত্র“মুক্ত হলে বর্তমান উপজেলা পরিষদের সামনে এক বিজয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বড়লেখার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজ উদ্দিন জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধে যেসব রাজাকার, আলবদর ঘরবাড়ি পুড়িয়েছে, মা-বোনের সম্ভ্রম হানি ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তাদের বিচার বাংলার মাটিতে হচ্ছে। সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন করে জাতিকে অবশ্যই অভিশাপমুক্ত করতে হবে।’
বড়লেখায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের উদ্যোগে দরিদ্র চা শ্রমিক, নৃ-গোষ্ঠী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে আর্থিক সহায়তা স্বরূপ ১৫ লাখ ১০ হাজার টাকার চেক বিতরণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত চেক বিতরণের সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ শাহাব উদ্দিন এমপি।
ইউএনও মুহাম্মদ সহেল মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন উপজেলা চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম সুন্দর, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ দাস নান্টু, উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার উদ্দিন, উপজেলা প্রকৌশলী বিদ্যুৎ ভুষণ পাল, থানার ওসি মুহাম্মদ সহিদুর রহমান, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হাওলাদার আজিজুল ইসলাম, সাংবাদিক আব্দুর রব, ইউপি চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদ, বিদ্যুৎ কান্তি দাস প্রমূখ।

কুলাউড়া 
মহান মুক্তিযুদ্ধে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৭১সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন সমগ্র দেশে বিজয় উৎসব ধ্বনিত হয় তার পূর্বে ০৬ডিসেম্বর এই উপজেলা সর্ম্পূনরুপে শত্রুমুক্ত হয়। এরপর থেকে দিন টিকে কুলাউড়াবাসী শত্রুমুক্ত দিবস হিসাবে পালন করে আসছেন। ১৯৭১সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর সারাদেশ যখন মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত হতে থাকে ঠিক ঐ সময় পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ থেকে মুক্তি সংগ্রামে কুলাউড়ার দেশ প্রেমিক মুক্তিকামী সন্তানরা হাতে তুলে নিয়েছিল অস্ত্র। এই উপজেলায় ব্যারিষ্টার আব্দুল মুক্তাকিম চৌধুরী, নবাব আলী সবদর খান রাজা, নবাব আলী সরওয়ার খান চুন্ন, আব্দুল লতিফ খান, মোঃ আব্দুল জব্বার, লুৎফুর রহমান চৌধুরী হেলাল, মোঃ আব্দুল মতিন, মোঃ মমরুজ বখ্শ মটু, আছকির আলী, আতাউর রহমান, মছাদুর রহমান, গিয়াস উদ্দিন আহমদ প্রমুখ মুক্তিযোদ্ধাদের সু-সংগঠিত করে ভারতে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এই উপজেলায় সর্বমোট ৫৮২জন মুক্তিযোদ্ধা সংক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কুলাউড়া উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সহ প্রায় ৪৫০জন শহীদ হন।
পাক বাহীনির প্রবেশ ও নির্মম গণহত্যা ঃ কুলাউড়া শহরে পাক বাহীনির প্রবেশ পথে ৭১সালের ৭মে কাপুয়া ব্রীজের কাছে গতিরোধ করেন অকুতোভয় বীর সৈনিক মোজাহিদ আলী সহ জয়চন্ডী ইউনিয়নের আছকির আলী ও হাবীব উদ্দিন। শুরু হয় সংঘর্ষ এক পর্যায়ে আছকির ও হাবীব গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। এই দুই জন’ই কুলাউড়া উপজেলার প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। তারপর পাক সেনারা একে একে হত্যা করে কটু মিয়া, আব্দুল কদ্দুছ, ছলিম উল্লাহসহ স্থানীয় ৫জন গ্রামবাসীকে। শহরের চৌমুহনায় এসে হত্যা করে ডেক্সী পাগল নামে একজনকে। এরপর বিকালে স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধীদের সহায়তায় বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্টানে হত্যা ও লুটপাট চালায়। শহরে প্রবেশ করে হত্যা করে ছাত্রলীগ থানা শাখার সভাপতি নুরুল ইসলাম ভূইয়া ও তার সহকর্মী সহ-বোডিং ম্যানেজার আব্দুর রহমানকে। পরে কুলাউড়া উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম থেকে রাজাকার সহযোগে পাক সেনারা ২২জন গ্রামবাসীকে ধরে এনে হত্যা করে। পরবর্তীতে ২৪মে ও ১৪জুন মীরবক্সপুর গ্রামে গিয়ে বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীকে হত্যা সহ একই গ্রামে গিয়ে নিধনযজ্ঞ চালায়। পাক বাহীনির ক্যাম্প তৈরী ঃ পাক সেনারা তৎকালিন থানা হাসপাতাল, রেলওয়ে ষ্টেশন, কুলাউড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করে ক্যাম্প। এসব ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন পাকিস্তানী মেজর মোগল ও ক্যাপ্টেন দাউদ। পাকিস্তানী সৈন্যের আগমনে স্বার্থানেষী ও স্বাধীনতা বিরোধীরা শান্তি কমিটি, আলবদল, রাজাকার, আল-সামস, কমিটি গঠন করে বাঙ্গালী নিধন যজ্ঞ চালায়।
যে স্থানে রয়েছে বধ্যভূমি ঃ স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক সেনারা সমগ্র উপজেলাব্যাপী নির্মম হত্যা, গণহত্যা, লুন্ঠন ও ধর্ষণ চালায়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজনকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে শহরের চাতলগাঁও কবরস্থান, কুলাউড়া নবীন চন্দ্র মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী রেললাইন এলাকা, রেলওয়ে ষ্টেশনের দক্ষিণ এলাকা, বিছরাকান্দি ও উত্তর জয়পাশা এলাকা ছাড়াও পৃথিমপাশা আলী আমজদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মুখ্যস্থান পদ্ম দীঘির পার, সীমান্তবর্তী এলাকা শরীফপুর ইউনিয়নের নৌ-মৌজা নামক স্থানে গণকবর দেয়। এসব স্থানগুলো আজও সংরক্ষন করা হয়নি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে এসব বধ্যভূমি। যে ভাবে শত্রুমুক্ত হয় কুলাউড়া ঃ নভেম্বর শেষ প্রান্ত থেকে ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ভারত ও বাংলাদেশ চুক্তি হওয়াতে যৌথ মিত্র বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লে যুদ্ধের গতি তীব্রভাবে বেড়ে যায়। থানার সবচেয়ে বড় ও সর্বশেষ অপারেশন হয় গাজীপুর চা-বাগানে উক্ত চা-বাগানে যুদ্ধের সময় পাকহানাদার বাহিনীর একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। নেতৃত্বে ছিলেন মেজর আব্দুল ওয়াহিদ মোগল। প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এক ব্যাটেলিয়ান সৈন্য বাগানে অবস্থান করছিল। অপরদিকে গাজীপুরের বিপরীতে চোঙ্গা বাড়ী নামক স্থানে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্প ছিল। নভেম্বরের শেষদিকে গাজীপুর মুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এতে নেতৃত্ব দেন এমএ মুমিত আসুক, প্রথমে সাগরনাল চা-বাগানে অবস্থান নেন তারা। উক্ত স্থানে মিলিত হন ধর্মনগর থেকে আগত কর্ণেল হর দয়াল সিংহ তার নেতৃত্বে ভারতীয় সেনা বাহিনী ৬৭রাজপুত রেজিমেন্টের বিরাট একটি দল বাগানে অবস্থান নেয়। ৩০নভেম্বর কাকুরা চা-বাগান অবস্থানকারী ৭৫জন রাজাকার ও ৫জন পাকিস্তানী সৈন্য ধরা পড়ে। ০১ডিসেম্বর কাকুরা চা-বাগান থেকে গাজীপুর চা-বাগান এলাকার দিকে মিত্র বাহিনীরা অগ্রসর হলে পাক সেনাদের সাথে পাল্টা গুলি বর্ষণ চলতে থাকে। ০২ডিসেম্বর রাতে যুদ্ধ হয়। ০৩ ডিসেম্বর ৪/৫ গোর্খা রেজিমেন্ট কর্ণেল হারকিলের নেতৃত্বে একটি দল সাহায্যে এগিয়ে আসে। পেছনে ৯৯মাইন্টেল ব্রিগেডের আর্টিলারী সহায়তায় রাতে প্রচন্ড যুদ্ধ হয় তবুও গাজীপুর চা-বাগান এলাকা দখল মুক্ত সম্ভব না হওয়াতে ০৪ডিসেম্বর যুদ্ধের পরিকল্পনা বদলে ফেলা হয়। পিছন দিক থেকে আক্রমন করার পরিকল্পনা নেন হারকিলর। সে অনুযায়ী এম এ মোমিত আসুক ও মোহন লাল সোম পিছনে আসার দায়িত্ব গ্রহণ করে রাত ১২টায় সম্মিলিত বাহিনী সবদিকে পাকিস্তানী বাহিনীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শেষ দিকে লষ্করপুর গ্রামে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনী এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। উক্ত যুদ্ধে প্রায় ২৫০জন পাক সেনা প্রাণ হারায়। ০৫ ডিসেম্বর গাজীপুর চা-বাগান এলাকা শত্রু মুক্ত হয়। ঐ দিনই সন্ধ্যার দিকে সম্মিলিত বাহিনী কুলাউড়ায় পৌছে, ঐ রাতেই সব পাকিস্তানী সৈন্য ব্রাহ্মণবাজারের দিকে সড়ক পথে কুলাউড়া ত্যাগ করে। এভাবেই ০৬ডিসেম্বর কুলাউড়া শত্রুমুক্ত হয়। উপজেলা শহরের লাল সবুজ স্বাধীনতার পতাকা আকাশে উড়তে থাকে।
কুলাউড়া উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুশীল চন্দ্র দে শত্রুমুক্তির স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন, সেই দিনের পৈশাচিকতা এখনও স্মৃতিতে ভয়াল রুপ নিয়ে ফিরে আসে প্রতি বছর। ০৭মে থেকে ০৬ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকসেনা ও তাদের দোসররা মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, যুবক ও কৃষকসহ প্রায় ৪৫০জনকে হত্যা করে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন প্রতি বছর উপজেলার বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষনের ব্যাপারে বিভিন্ন সময় মিটিংয়ে আলাপ আলোচনা হলেও বিষয়টির অগ্রগতি হচ্ছে না। বিজয়ের এ মাসে অবিলম্বে যোদ্ধাপরাধীর বিচারকাজ সম্পন্ন করা এবং উপজেলার সকল বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিত করে সংরক্ষনের জন্য তিনি যথাযথ কতৃপক্ষের প্রতি জোর দাবী জানান।