সদ্য সংবাদ

মঞ্চে দুই সহোদরার ২০ বছর

888

হাসানাত কামাল

জ্যোতি সিনহা ও স্বর্ণালি সিনহা স্মৃতি। নিভৃতে কাজ করে যাওয়া মঞ্চনাটকের দুই শক্তিমান অভিনেত্রী। শুধু তাই নয়, সমানতালে ২০ বছর ধরে তারা মঞ্চে কাজ করে যাচ্ছেন। শুরুর গল্পটা ১৯৯৭ সালের। গুরুজি শুভাশিস সিনহার হাত ধরে ‘আজবপুরের বর্ষবরণ’ নাটকে রাজকুমারীর চরিত্রে প্রথমবারের মতো অভিনয় করেন জ্যোতি সিনহা। ছোট বোন স্মৃতির বয়স তখন সবে সাত। শুভাশিস সিনহার নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় ‘আমি আহিলেই’ নাটকে শিশুশিল্পী হিসেবে কথক (পালাকার) চরিত্রে স্মৃতির অভিনয়জীবন শুরু। এরপর ডিম্ব রাজার দেশে, জুতা আবিষ্কার, ধ্বজো মেস্তোরীর মরণ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, দেবতার গ্রাস’সহ শুভাশিস সিনহার নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় প্রায় ২০টির বেশি নাটকে তারা দুই বোন অভিনয় করেন।

১৯৯৬ সালে মৌলভীবাজারে শুভাশিস সিনহার হাত ধরে সৃষ্টি হয় নাট্যদল মণিপুরি থিয়েটার। এখন পর্যন্ত ২৯টি নাটক প্রযোজনা করেছে এ থিয়েটার। এর মধ্যে ‘কহে বীরাঙ্গনা’ ও ‘দেবতার গ্রাস’ সমাদৃত হয়েছে দেশের বাইরেও। কহে বীরাঙ্গনায় কাজ করার পর জ্যোতির জীবনের মোড় ঘুরে দাঁড়ায়। যেখানে স্মৃতি সমাদৃত হন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও দেবতার গ্রাসের মাধ্যমে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের বীরাঙ্গনা কাব্য থেকে কহে বীরাঙ্গনা নাটক নির্মাণ করেছেন শুভাশিস সিনহা। যেখানে একক অভিনয়ে ছিলেন জ্যোতি। জ্যোতি সিনহার ভাষ্যমতে, কহে বীরাঙ্গনা নাটকের চারটি চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা তার জন্য ছিল প্রায় সাধনাসম। ছন্দের ভেতরে থেকে কাজ করতে হয়েছিল তাকে। এ পর্যন্ত ৫৪টি শো হয়েছে নাটকটির। এ নাটকে জ্যোতির অভিনয়, সংলাপ প্রক্ষেপণে স্পষ্টতা, উচ্চারণের শুদ্ধতা, নৃত্যগীতে দক্ষতা— এসব মিলিয়ে জ্যোতি সিনহার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন নাট্যকার রামেন্দু মজুমদার।

তবে এ নাটক করতে গিয়ে আর্থিক সংকটের মধ্যেও জ্যোতি সিনহাকে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। জ্যোতি বলেন, ‘সেটা ২০১০ সালের ঘটনা। আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব আমার কাঁধে চাপে। মা-বোনের দেখাশোনা করতে হতো। নাটকে মনোযোগী হব নাকি চাকরি করব, এ বিষয়ে পড়েছিলাম দোটানায়। কহে বীরাঙ্গনা নাটকটি প্রচুর সময়, সাধনা, ধ্যান দাবি করছিল। তখনো সরকারি চাকরি পাওয়ার বয়স ফুরিয়ে যায়নি। আমি ভাবলাম চাকরি তো পরেও জুটিয়ে নেয়া যাবে, কিন্তু নাটকটি করার সুযোগ বারবার আসবে না। তখন একটি এনজিওয়ে চাকরি করতাম। সেটাও দিলাম ছেড়ে। টানা তিন বছর চাকরি করিনি। তখন অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু দর্শকের যে ভালোবাসা পেয়েছি, তাতে সব কষ্ট নিমিষে মিলিয়ে গেছে।’ অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা অবলম্বনে শুভাশিস সিনহার নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় মণিপুরি থিয়েটারের আরেকটি জনপ্রিয় নাটক দেবতার গ্রাস।

২০১২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রকল্পেগু নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। এতে মা ও ছেলের প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেন জ্যোতি ও স্মৃতি। ওই বছর ভারতের আগরতলা ও শিলচরে দেবতার গ্রাস নাটক মঞ্চায়ন ও প্রশংসা অর্জন করে। পাশাপাশি ভারতের বিখ্যাত পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়ার আমন্ত্রণে কলকাতায় কহে বীরাঙ্গনা মঞ্চায়ন হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্যোতি সিনহা নৃবিজ্ঞান ও স্মৃতি সিনহা  লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর অর্জন করেছেন। ২০১৬ সালে এমফিল সম্পন্ন করেন জ্যোতি। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা দুজনই নাট্যদলের কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

নাটকের পাশাপাশি নাচেও সমান দক্ষতা দুই বোনের। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে জ্যোতি সিনহা মণিপুরি বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী তামান্না রহমানের কাছে কয়েক বছর তালিম নেন। ২০১৩ সালে ভারত সরকারের আইসিসিআর বৃত্তি নিয়ে মণিপুরি নৃত্য শেখার জন্য রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেলেও চাকরির জন্য আর ভর্তি হননি। একই বছর মৌলভীবাজার জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে কালচারাল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন ও বর্তমানে সেখানেই বহাল রয়েছেন। এখনো কর্মরত আছেন। স্বর্ণালি নাচ শিখছেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশে আগত উদীয়মান শিল্পী সুইটি দাস চৌধুরীর কাছে।

এ পর্যন্ত প্রাচ্যনাট্য, পৌরি, জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে সম্মাননা পেয়েছেন এ দুই বোন। ২০১২ সালে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার ও ২০১৭ সালে প্রথম আলোয় বর্ষসেরা আলোচিত মুখ হিসেবে নাম আসে। সর্বশেষ আরণ্যক নাট্যদলের ৪৫ বছর পূর্তি উত্সবে দীপু স্মৃতি পদক-২০১৭ পান জ্যোতি সিনহা।

অবশ্য এরই মধ্যে বিভিন্ন টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন জ্যোতি। সর্বশেষ এনটিভিতে ‘পাগলা হাওয়ার দিন’ ধারাবাহিকে অভিনয় করেন। বড় বোনের সঙ্গে স্বর্ণালিও কিছু নাটকে কাজ করেছেন, তবে তার বেশি আগ্রহ ফটোশুট মডেলিংয়ে। আগ্রহ রয়েছে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়েও। ভবিষ্যত্ ভাবনার কথা জানতে চাইলে দুই বোন উত্তর দেন, ‘দেখতে দেখতে ২০ বছর পার হয়েছে, আমরা মনপ্রাণ দিয়ে আরো কাজ করব, বিশ্বনাট্য তথা বাংলা নাট্য ইতিহাসের সঙ্গে সমৃদ্ধশালী মণিপুরি ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা ও আধুনিক মঞ্চ/থিয়েটারধারার মেলবন্ধন ঘটানোর জন্য সাধনা করে যাব।’ নাটকে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে চান জ্যোতি সিনহা। আর বড় বোনের মতো ছোট বোন স্বর্ণালি সিনহা স্মৃতির ইচ্ছা আছে নৃত্য নিয়ে দেশের বাইরে পড়াশোনা করার।

(বনিকবার্তা থেকে সংগ্রহ)